• শিরোনাম

    মানবসেবা রাসূল সা:-এর সুন্নত

    মুফতি মোজ্জাম্মেল হক রাহমানি | ৩০ নভেম্বর ২০২২ | ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 430 বার

    মানবসেবা রাসূল সা:-এর সুন্নত

    মানুষ সামাজিক প্রাণী-জীব। পদে পদে, ধাপে ধাপে প্রয়োজন একে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থন। এমনকি কখনো বিশাল সম্পদ-প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও একে অপরের সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। পারস্পরিক সহায়তা-সহানুভূতি, কল্যাণ কামনা ও মুহাব্বত-ভালোবাসার চেতনা সামাজিক প্রয়োজন-চাহিদা পূরণের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সে-ই মানুষ যে অন্যের কল্যাণ কামনা করে এবং সহানুভূতি প্রকাশ করে।
    রাসূলুল্লাহ সা:-এর সমগ্র জীবনই ছিল মানবসেবার মহান দৃষ্টান্ত। নবুওয়াতের আগে তিনি সমাজসেবা, অসহায়-অভাবীদের সাহায্য-সহযোগিতা এতিম-গরিবদের প্রতি সহায়তা-সহানুভূতি ও গরিব-দুঃখীদের দায়িত্ব গ্রহণসহ বহু জনকল্যাণ কাজের জন্য ছিলেন সুপরিচিত ও প্রসিদ্ধ। নবুওয়াত লাভের পর মানবতার জন্য তাঁর অনুগ্রহ ছিল নজিরবিহীন। পুরো জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানবতার জন্য। তিনি শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, তাকে প্রেরণ করা হয়েছে সবার জন্য। সঙ্গত কারণেই গোটা জাতির প্রতি ছিল তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও ইহকাল-পরকালের মুক্তির জন্য ছিল তার অক্লান্ত সংগ্রাম-প্রচেষ্টা। তাই আমাদের কর্তব্য তার উত্তম আদর্শের অনুসরণ করা ও মানবসেবাকে নিজেদের জীবনের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নেয়া।
    যখন সর্বপ্রথম ওহি নাজিল হলো জিবরাইল আমিন তিন তিনবার রাসূলুল্লাহ সা:-কে বুকে জড়িয়ে চাপ দিলেন। শোনালেন ওহির বাণী-‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ কাঁপতে কাঁপতে রাসূলুল্লাহ সা: ঘরে এলেন। পুরো ঘটনা খুলে বললেন উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা রা:কে। তখন উম্মুল মুমিনিন যে কথাগুলো বলে রাসূলুল্লাহকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন তা ছিল, ‘কখনোই নয়! আল্লাহর কসম, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কখনো বিব্রত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, দুস্থের ভার বহন করেন, নিঃস্বের জন্য উপার্জন করেন, মেহমানের সমাদর করেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে (মানুষের) সহযোগিতা করেন (বুখারি-৩, মুসলিম-১৬০)।
    সুতরাং উপরোক্ত হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, দুস্থ-দুর্বলের দায়িত্ব গ্রহণ করা, নিঃস্ব-অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের সহযোগিতা করা রাসূলুল্লাহ সা:-এর সুন্নত।
    অপর বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- কোনো এক সময় রাসূলুল্লাহ সা: বসে থাকা কয়েকজন লোকের পাশে এসে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কে এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট কে? তা কি আমি তোমাদেরকে অবহিত করব না?’ বর্ণনাকারী বলেন, সবাই চুপ করে রইল। তারপর তিনি ওই কথা তিনবার জিজ্ঞেস করেন। তারপর এক ব্যক্তি বলল, জি, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে জানিয়ে দিন, কে আমাদের মধ্যে সর্বাধিক উত্তম এবং কে সর্বাধিক নিকৃষ্ট। তিনি বললেন, ‘সেই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম যার কাছে কল্যাণ কামনা করা যায় এবং যার ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকা যায়। আর সেই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট যার কাছে কল্যাণের আশা করা যায় না এবং যার ক্ষতি থেকেও নিরাপদ থাকা যায় না’ (তিরমিজি-২২৬৩)।
    আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সেবাকে সৃষ্টিকর্তার সেবা বলেছেন। সহিহ মুসলিম শরিফে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আদম সন্তান; আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, তুমি আমার সেবা-শুশ্রƒষা করোনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আপনি তো বিশ্বপালনকর্তা, কিভাবে আমি আপনার সেবা-শুশ্রƒষা করব? তিনি বলবেন, তুমি কি জানতে না, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, তাকে তুমি দেখতে যাওনি। তুমি কি জানতে না, যদি তুমি তার সেবা-শুশ্রƒষা করতে, তার কাছেই আমাকে পেতে। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাওনি? বান্দা বলবে, হে আমার রব! আপনি হলেন বিশ্বপালনকর্তা, আপনাকে আমি কিভাবে আহার করাব? তিনি বলবেন, তুমি কি জানো না, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, তুমি খাবার দাওনি। তুমি কি জানো না, তুমি যদি তাকে আহার করাতে, আজ আমার কাছ থেকে এর পরিপূর্ণ বিনিময় পেতে।’ আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে পানীয় দাওনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রভু! আপনি তো রাব্বুল আলামিন, আপনাকে আমি কিভাবে পান করাব? তিনি বলবেন, তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানীয় চেয়েছিল, তাকে তুমি পানীয় দাওনি। তাকে যদি পান করাতে, আজ আমার কাছ থেকে পরিপূর্ণ বিনিময় পেতে’ (মুসলিম-২৫৬৯)।
    যারা বাতি জ্বালিয়ে অন্যের ঘর আলোকিত করে, এমন লোকের অস্তিত্ব বিরল-দুর্লভ না হলেও যথেষ্ট অভাব রয়েছে, যারা মানবতার মর্যাদা রক্ষা করেন ও মজলুম-নিপীড়িতদের দুঃখ-কষ্ট নিরাময়ের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান, তাদের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষের মধ্যে এমন এক হাজারও পাওয়া যাবে না, যারা দরিদ্রদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে চায়, অসুস্থ-দুর্বলদের ভালোবাসতে চায়। অনেক ধনী ব্যক্তি আছেন জনকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয় বটে; কিন্তু দরিদ্র নিকটাত্মীয়ের প্রতি নেই যথাযথ লক্ষ্য-ভ্রƒক্ষেপ! বহু ব্যবসায়ী আছেন অসহায়-দুস্থদের যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা করেন; কিন্তু দোকানে আসা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দরিদ্র ক্রেতার অনুভূতি-আবেগ বুঝতে অক্ষম। জনকল্যাণমূলক কাজ ও অসহায়-দুস্থদের সাহায্য-সহযোগিতায় সক্রিয় থাকা যেমন জরুরি, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও ব্যবসায়-বাড়ির কাজ করে এমন অভাবী লোকদের সেবা ও সাহায্য-সহযোগিতা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
    রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘আল্লাহর কসম, সে প্রকৃত মুমিন নয়, আল্লাহর কসম, সে প্রকৃত মুমিন নয়, আল্লাহর কসম, সে প্রকৃত মুমিন নয়। বলা হলো, কে সে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, ওই ব্যক্তি যার কষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়’ (সহিহ বুখারি-৫৫৫)।
    আজ মূল্যস্ফীতির কারণে সবাই অর্থনৈতিক সঙ্কট ও নানা সমস্যায় ভুগছে। এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে একে অপরের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা একান্ত কর্তব্য হয়ে পড়েছে। বাড়িওয়ালার জন্য ভাড়া হ্রাস করা, ঋণদাতার জন্য ঋণগ্রস্তকে আরো সুযোগ দেয়া, মালিক ও কর্মকর্তার জন্য যথাসম্ভব কর্মচারীর যতœ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর এই সংক্ষিপ্ত জীবনে আমরা যদি সৃষ্টির সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসি, তবে পরকালের অনন্ত জীবনে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আমাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসবেন। আল্লাহ সবাইকে তৌফিক দান করুন। আমীন।
    লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, মদিনাতুল উলুম মাদরাসা, বসুন্ধরা, ঢাকা

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ২৪ এপ্রিল ২০২০

    ০৩ এপ্রিল ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০ 
  • ফেসবুকে দশদিক