• শিরোনাম

    গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা

    প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী | ১৭ নভেম্বর ২০২২ | ৮:১০ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 262 বার

    গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা

    ইসলাম আল্লাহপাক প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ ও তাঁর মনোনীত একমাত্র জীবনব্যবস্থা (কুরআনের ভাষায় আদ দ্বীন)। আল্লাহর বাণী- ‘আল্লাহর নিকট মনোনীত একমাত্র দ্বীন বা জীবনবিধান হলো ইসলাম’ (সূরা আলে ইমরান: ১৯)। শুধু মুহাম্মদ সা:-এর ওপর অবতীর্ণ দ্বীনই নয় সব নবী-রাসূলের দ্বীন ছিল ইসলাম। শুধু বর্তমান বিশ^ব্যবস্থা নয়, অতীতকালেও বিভিন্ন দার্শনিকদের মধ্যে যেসব কল্যাণচিন্তার উদ্ভব ঘটেছে তারও পেছনে রয়েছে আসমানি কিতাবের অবদান। মানবজীবনে ভালো ও মন্দ- দুটোর পেছনে রয়েছে মানুষের বিবেকবুদ্ধি। শয়তান মানুষের মধ্যে মন্দ কর্মপ্রেরণা জোগায় আর আল্লাহপাক জোগান কল্যাণচিন্তা। অন্যান্য সৃষ্টি থেকে মানুষের পার্থক্য ও শ্রেষ্ঠত্বের মূলে রয়েছে তার স্বাধীন চিন্তা-ভাবনা ও কর্ম করার শক্তি। মন্দ পরিহার করে ভালো করলে মানুষ পুরস্কৃত হবে এবং মন্দ করলে তিরস্কৃত হবে। ভালো-মন্দের মানদণ্ড হলো আল্লাহপাকের সর্বশেষ কিতাব আল কুরআন অর্থাৎ ইসলাম।
    ইসলাম যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান সেহেতু রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আল কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবনেই রয়েছে। না থাকলে তো আর পূর্ণাঙ্গ হয় না। আর আল্লাহর দাবি, দ্বীন পরিপূর্ণ মানতে হবে। তাঁর বাণী- ‘তোমরা কি দ্বীনের কিছু অংশ মানবে ও কিছু অংশ অমান্য করবে, তাহলে দুনিয়ার জীবনে রয়েছে জিল্লতি ও আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ আজাব’ (সূরা বাকারা: ৮৫)।

    ইসলাম মূলত একটি রাষ্ট্রীয় দ্বীন। ইসলামকে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করার মিশন দিয়েই আল্লাহপাক সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ সা:-কে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালার বাণী- ‘তিনি তাঁর আপন রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন যাতে সব দ্বীন বা ব্যবস্থাপনার ওপর তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করতে পারেন, মুশরিকরা যতই অপছন্দ করুক না কেন’ (সূরা সফ-৯)। একই কথা সূরা তওবা (৩৩ নং আয়াত) ও ফাতাহ (২৮ নং আয়াত) একটু হেরফের করে বলেছেন। শুধু কি তাই? সব নবী-রাসূলের মিশনও ছিল একই। আল্লাহর বাণী- ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য সে বিধানই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহ আ:কে এবং যা আমি তোমার কাছে ওহি করে পাঠিয়েছি, উপরন্তু যার আদেশ আমি ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম, তোমরা এ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করো এবং এতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না’ (সূরা আশ শূরা: ১৩)।
    দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই সব নবী-রাসূলের সাথে সমসাময়িক শাসকগোষ্ঠীর বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে এবং হক ও বাতিলের এই দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। রাসূলুল্লাহ সা: কর্তৃক দ্বীন প্রতিষ্ঠার ফলেই আমাদের পক্ষে মুসলমান হওয়া সম্ভব হয়েছে।

    দ্বীন কায়েমের জন্য স্র্রেফ আকাক্সক্ষা নয়, প্রয়োজন সঙ্ঘবদ্ধ প্রচেষ্টা। সঙ্ঘবদ্ধতার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহর বাণী- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেভাবে করা উচিত আর মুসলমান না হয়ে মরো না। তোমরা আল্লাহর রজ্জু শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (সূরা আলে ইমরান : ১০২-১০৩)। আমাদের মুসলমান হওয়া সঙ্ঘবদ্ধতার ওপর নির্ভর করে। নবুয়ত লাভের পর মুহাম্মদ সা:-এর প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকা এবং তাঁর ডাকে যারা সাড়া দিয়েছেন তাদেরকে সাথে নিয়ে এক মজবুত সংগঠন কায়েম করা। রাসূলুল্লাহ সা:-এর নেতৃত্বে গঠিত সংগঠনের বাইরে কেউ আর নিজেকে মুসলিম দাবি করতে পারত না এবং সে সুযোগও ছিল না। কিন্তু বর্তমানে দ্বীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একাধিক সংগঠন থাকতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন উদ্দেশ্য হলে অবশ্যই বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি থাকবে। যদি তা থাকে তাহলে বুঝতে হবে সবাই সত্যপন্থী ও হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যথায় পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও দলাদলি সৃষ্টি করা সুস্পষ্ট কুফরি ও এর পরিণতি ভয়াবহ। আল্লাহর ভাষায়- ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা দলে দলে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য হেদায়াত পাওয়ার পরও মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে। যারা এ নীতি অবলম্বন করেছে তারা সে দিন কঠিন শাস্তি পাবে। যেদিন কিছু লোকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এবং কিছু লোকের মুখ কালো হয়ে যাবে। তাদেরকে বলা হবে, ঈমানের নিয়ামত লাভ করার পরও তোমরা কুফরি নীতি অবলম্বন করলে? ঠিক আছে, তাহলে এখন এই অস্বীকৃতির বিনিময়ে আজাবের স্বাদ গ্রহণ করো’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৫-১০৬)।

     

    জমিনে ঈমানদারদের কর্তৃত্ব প্রদান আল্লাহপাকের প্রতিশ্রুতি। ঈমানদারদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই মূলত দ্বীন প্রতিষ্ঠা। আবু জেহেল-আবু লাহাবদের হাত থেকে সমাজের কর্তৃত্ব রাসূলুল্লাহ সা: ও তাঁর অনুসারীদের হাতে চলে আসাটাই ছিল দ্বীনের বিজয় এবং এর ফলে মানুষের পক্ষে পরিপূর্ণ দ্বীন মানা সহজ হয়ে পড়ে। আর প্রকৃত বিষয় হলো, দ্বীন প্রতিষ্ঠার আগে আল্লাহপাক সেই দ্বীনের শরিয়ত পুরোপুরি দান করেননি। ইসলামের অনুসারীদের মৌলিক কাজ হলো দ্বীন কায়েমের জন্য প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালানো। আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টাকারীদের সব গুনাহের ক্ষমা এবং জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে আল্লাহর সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয়েরও ওয়াদা রয়েছে (সূরা সফ : ১০-১৩)। দ্বীনের বিজয়ের জন্য প্রয়োজন ঈমানের সাথে নেক আমলে সমৃদ্ধ হওয়া। এই নেক আমল হলো আচার-আচরণ, লেনদেন ও ব্যবহারিক জীবনে ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাকের বাণী- ‘আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে তাদের তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদের দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যে দ্বীনটি আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা যেন শুধু আমার ইবাদত করে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক না করে। আর যারা এরপরও কুফরি করবে তারাই ফাসেক’ (সূরা নূর: ৫৫)।

     

    এখন প্রশ্ন, দ্বীন কায়েমের প্রক্রিয়া কী? যেকোনো আদর্শই প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সেই আদর্শের ব্যাপক প্রচার এবং তার ভিত্তিতে একদল যোগ্য নেতা ও কর্মী গঠন। সেই সাথে প্রয়োজন জনমত গঠন। ইসলাম এর থেকে ব্যতিক্রম কিছু নয়। নবী হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রথম কাজ ছিল মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। দাওয়াতে যারা সাড়া দিয়েছেন তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনিয়েছেন ও পরিশুদ্ধ করেছেন। জনমত অনুকূলে না হওয়ায় রাসূলুল্লাহ সা:-এর সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহপাক মক্কায় দ্বীনের প্রাথমিক বিজয় দান করেননি। কিন্তু মদিনার জনগণ ইসলামকে গ্রহণ করে নেয়ায় আল্লাহ তায়ালা দয়া করে মদিনায় সর্বপ্রথম ইসলামের বিজয় দান করেন। এটি স্পষ্ট, দ্বীনের বিজয়ের জন্য আল্লাহর রাসূল সা: কোনো বাঁকা পথ গ্রহণ করেননি। সন্ত্রাস বা জঙ্গি কার্যক্রম নয়, স্বাভাবিক পন্থায় দাওয়াত প্রদান, সংগঠন কায়েম, নেতৃত্ব ও কর্মী গঠন- এই ছিল তাঁর প্রক্রিয়া। মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর তিনি এবং তাঁর সাহাবিরা একতরফা নির্যাতিত হয়েছেন; তাঁদের পক্ষ থেকে গোপনে বা প্রকাশ্যে পাল্টা আঘাত বা কোনো ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণের ঘটনাও ছিল না। শুধু মুহাম্মদ সা:-এর জীবনেই নয়, কুরআনে বর্ণিত সব নবী-রাসূল ও ঈমানদারদের আল্লাহপাক জুলুমের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

     

    আল্লাহপাক সব নবী-রাসূলকে দ্বীন কায়েমের মিশন দিয়েই পাঠিয়েছেন এবং দ্বীন কায়েমের প্রক্রিয়াও সবার এক ছিল। অর্থাৎ দ্বীনের দাওয়াত দান, তাদেরকে সংগঠিত ও পরিশুদ্ধ করা। নবী-রাসূল আল্লাহপাক কর্তৃক নিযুক্ত এবং নবীর ওপর ঈমান আনার সাথে সাথে শর্তহীন আনুগত্য ঈমানদারদের জন্য ফরজ। নবী-রাসূলের জীবিত অবস্থায় কোনো বিকল্প নেতৃত্ব নেই এবং সে ক্ষেত্রে নবী-রাসূলের একক নেতৃত্ব। রাসূলের অনুপস্থিতিতে পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচন পরামর্শের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়েছে। মুমিন চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহপাক বলেছেন- ‘যারা নিজেদের সব কাজ পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে’ (সূরা শুরা: ৩৮)। রাসূলুল্লাহ সা:-এর ইন্তেকালের পর খলিফা নির্বাচন পরামর্শের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়েছিল। যেখানেই সামষ্টিক স্বার্থ রয়েছে সেখানেই পরামর্শ। রাসূল সা: আল্লাহ তায়ালার মনোনীত হওয়ার পরও আল্লাহ তাঁর নবীকে বিভিন্ন পরামর্শে তাঁর সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বলেছেন। তাঁর বাণী- ‘(হে নবী!) এটি আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ যে, তোমার ব্যবহার তাদের প্রতি বড়ই কোমল। নয়তো যদি তুমি রুক্ষ স্বভাবের বা কঠোর চিত্ত হতে, তাহলে তারা সবাই তোমার চারপাশ থেকে সরে যেত। তাদের ত্রুটি ক্ষমা করে দাও। তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করো এবং দ্বীনের ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো। তারপর যখন কোনো মতের ভিত্তিতে তোমার স্থির সঙ্কল্প হবে তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন যারা তাঁর ওপর ভরসা করে’ (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)। (আগামী দিন সমাপ্য )
    লেখক: উপাধ্যক্ষ (অব:), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ২৪ এপ্রিল ২০২০

    ০৩ এপ্রিল ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০ 
  • ফেসবুকে দশদিক