সাদিয়া আফরিন | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 562 বার
বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতাবাদের শিকার হয়ে বিশ্বের মুসলিমরা এক ক্রান্তিকালে এসে পৌঁছেছে। মুসলিম উম্মাহর বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, উম্মাহর এই ক্রমবর্ধমান সঙ্কটের নেপথ্যে রয়েছে কুরআন-বিমুখতা, ঈমানি অবয়, ঐক্যহীনতা, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা। মতাদর্শ ও মাজহাবের ভিন্নতা বা শিয়া-সুন্নি মতবাদসহ বিভিন্ন মতভেদে মুসলিম জাতি বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী ও ফেরকায় বিভক্ত হয়ে মেতে উঠেছে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির মতো নব্য ফিতনায়। ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী দেশগুলো আজ স্বার্থান্ধতায় আক্রান্ত। পার্থিব ভোগ বিলাসিতা ও কুরআন-বিমুখতা মুসলিম রাষ্ট্রনেতাদের ঈমানি চেতনাকে অবশ করে দিয়েছে ।
ইসলামের প্রকাশ্য শত্রুদের মদদ বা জৌলুসপূর্ণ প্রস্তাবের কাছে তারা সঙ্কোচহীনভাবে তাদের ঈমানি ভ্রাতৃত্ববোধ ও নিজস্ব স্বকীয়তা বিকিয়ে দিচ্ছে। মুসলিমদের এই অভ্যন্তরীণ বৈরিতা ইসলাম-বিদ্বেষীদের ষড়যন্ত্রের নীলনকশাকে জোরালো করছে। সৌদি আরব কর্তৃক ইয়েমেন আক্রমণ, সৌদি বনাম ইরান বৈরিতা ও সম্প্রতি আমিরাত ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের মধ্যে চুক্তি এ ধরনের লজ্জাজনক ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। অথচ রাসূল সা: বলেছেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ওপর অত্যাচার করবে না, কিংবা তাকে জালিমের হাতে সোপর্দও করবে না।
যে মুসলমান তার ভাইয়ের (মুসলমানের) একটা অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার অভাব পূরণ করবেন। কোনো ব্যক্তি মুসলমানের বিপদ দূর করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার বড় কোনো বিপদ দূর করবেন। যে ব্যক্তি মুসলমানের কোনো দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ২২৬৬) একজন মুসলমানের কাছে নিরাপত্তা পাওয়া অন্য মুসলমানের ঈমানি অধিকার, কিন্তু আজ রূঢ় বাস্তবতা এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যেখানে কোনো মুসলমানের জান-মাল রায় অন্য মুসলমান এগিয়ে আসছে না, বরং একে অপরের শক্র ও প্রতিপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিম জাহানের জন্য এর চেয়ে দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।
মুসলিম বিশ্বের এই চলমান সঙ্কট নিরসনে গোটা মুসলিম জাতিকে সুসংগঠিত ও একতাবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। সৌহার্দ্য ও সঙ্ঘবদ্ধ থাকা ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর একটি। অনৈক্য-বিভেদ থেকে দূরে থেকে অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি রা করা সুন্নাহ ও দ্বীনি বিধানের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গোটা মুসলিম সম্প্রদায়ই আজ দ্বীনের এই সুস্পষ্ট বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। ইসলামী শরিয়াহ মতে ফ্যাসাদ ও অন্তর্কোন্দলে লিপ্ত হওয়া কবিরা গুনাহ ও হারাম। আর মুসলিম উম্মাহর ভেতরে অনৈক্য-বিভেদ সৃষ্টি করা কুফর ও তাওহিদ পরিপন্থী।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য জায়গায় পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সূরা আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো। পরস্পর বিবাদ করো না, তাহলে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে…।’
সূরা আল ইমরানে ১০৩ ও ১০৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না…। আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তাদের কাছে সুস্পষ্ট বিধান পৌঁছার পরও তার বিরোধিতা করেছে। এদের জন্য রয়েছে কঠিন আজাব।’ আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা স্বীয় দ্বীনকে খণ্ডবিখণ্ড করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।’ (সূরা আনআম: ১৫৯)
নবী কারিম সা: বলেছেন, ‘মুমিন মুমিনের জন্য প্রাচীরস্বরূপ, যার একটি অংশ অপর অংশকে দৃঢ়তা ও শক্তি প্রদান করে।’ (বুখারি ও মুসলিম) ‘মুসলিমরা সবাই মিলে একটি অভিন্ন দেহের মতো, যার চোখ বা মাথায় ব্যথা হলে গোটা দেহের কষ্ট হয়, দেহের কোথাও ব্যথা লাগলে গোটা দেহ জ্বরাকরাচন্ত হয়।’ (সহিহ মুসলিম ও বুখারি)
রাসূলুল্লাহ সা:-এর আবেগমাখা দরদি কণ্ঠে বারবার উচ্চারিত হয়েছে, ‘তোমরা (মুসলিম উম্মাহ) একে অপরের ভাই ভাই’ ও ‘মুসলমানের সর্বাপো মজবুত আমল হচ্ছে পারস্পরিক মহব্বত।’
কিন্তু মুসলিম জাহানের বর্তমান পরিস্থিতি কুরআন-সুন্নাহর বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। দুনিয়ার মোহ, কুরআন-বিমুখতা আমাদের অন্তরকে সিলগালা করে দিয়েছে। চোখ থাকতেও আজ আমরা বরণ করে নিয়েছি অন্ধত্ব। কাশ্মির, উইঘুর, রাখাইন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ফিলিপাইন, চেচনিয়ার মুসলমানরা আজ বর্বর নির্যাতনে কাতর। মুসলমানের আর্তনাদ আজ কোনো মুসলমানের কর্ণকুহরে পৌঁছে না। অথচ ইসলামে পূর্বপুরুষদের ইতিহাস রচিত হয়েছে পারস্পরিক মহব্বত, ভ্রাতৃত্বের নজির স্থাপনকারী সব ঘটনা। যুগে যুগে ইসলামের সফলতা এসেছে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য সমুন্নত রাখার মাধ্যমেই। মুসলিম দেশগুলোর যে সম্পদ ও সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি স্থাপন করা গেলে মুসলমানদের অন্য কারো সাহায্য বা মুখাপেতিার প্রয়োজন হতো না।
এ কথা অনস্বীকার্য, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, আদর্শিক সঙ্ঘাত ও অনৈক্য মুসলিমদের উন্নতি ও সফলতার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক। বিপর্যস্ত মুসলিম উম্মাহর রুগ্নদশা থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য সবার আগে প্রয়োজন কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন গঠন ও দ্বীনি বিধান মোতাবেক ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে পারস্পরিক সংহতি, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরিত করার মাধ্যমে পুরো মুসলিম উম্মাহকে সঙ্ঘবদ্ধ ও সুসংগঠিত করা। কুরআনে প্রদর্শিত পথ ও সুন্নাহর অনুসরণে ঐক্যবদ্ধ হওয়াতেই অবসান ঘটতে পারে মুসলিম জাহানের চলমান দুর্দশার চক্র।
লেখিকা : শিার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।
| শনি | রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | |||
| ৫ | ৬ | ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ |
| ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ |
| ১৯ | ২০ | ২১ | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ |
| ২৬ | ২৭ | ২৮ | ২৯ | ৩০ | ||