ওয়াসেক চৌধুরী, জাপান | ০৫ মার্চ ২০২৬ | ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 100 বার
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিল। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি ছিল একটি জাতির আত্মমর্যাদা, স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ। সেই সংগ্রামে প্রায় ১৪০০-এর অধিক ছাত্রজনতা জীবন উৎসর্গ করেছে এবং ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। এই রক্ত, ত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে অর্জিত সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাই এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই সংগ্রামের চেতনাকে অস্বীকার করা, প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা খাটো করার যে কোনো অপচেষ্টা শুধু রাজনৈতিক অসতর্কতা নয়—এটি জাতির সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণার শামিল।
আমরা বর্তমান সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে সতর্ক করে বলতে চাই—জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কিংবা আইনের অপব্যবহার ও প্রক্রিয়াগত কৌশলের মাধ্যমে জনগণের রায়কে পাশ কাটানোর কোনো প্রচেষ্টা করা হলে তার পরিণতি শুভ হবে না। বাংলাদেশের জনগণ অতীতে দেখেছে কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে জনগণই শেষ পর্যন্ত সোচ্চার হয়েছিল এবং রাজপথে নেমে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখার কোনো প্রচেষ্টা কখনো স্থায়ী হয়নি। সুতরাং একই ধরনের পদ্ধতিতে আবারও জনগণের ইচ্ছাকে খর্ব করার চেষ্টা করা হলে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
সরকার একদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে আদালতনির্ভর বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে—এটি দ্বিচারিতার ইঙ্গিত বহন করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান রাজনৈতিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। যদি কোনো সংস্কার প্রস্তাব থাকে, তবে তা অবশ্যই স্বচ্ছ আলোচনা, জনমতের প্রতিফলন এবং সংসদীয় বিতর্কের মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি হওয়াই গণতান্ত্রিক পথ। আদালতকে রাজনৈতিক সমাধানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা বিচারব্যবস্থার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
জুলাইয়ের চেতনা কেবল একটি মাসের স্মৃতি নয়; এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং জনগণের সার্বভৌম অধিকারের প্রতীক। এই চেতনা একটি প্রজন্মকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—রাষ্ট্র কাদের জন্য, ক্ষমতার উৎস কোথায় এবং জনগণের ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই এই চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখা কেবল কোনো একটি রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি দায়িত্বশীল নেতার নৈতিক কর্তব্য।
যদি এই চেতনাকে অস্বীকার করা হয়, যদি জনগণের রক্তে অর্জিত সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামকে খাটো করা হয় বা অবমূল্যায়ন করা হয়, তাহলে জনগণ অবশ্যই তাদের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হবে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মাথা নত করেনি; বরং প্রতিবারই তারা সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
জুলাই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়ানো যে কোনো নির্বাচন বা সরকারের নৈতিক বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে। কারণ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈধতা কেবল আইনগত কাঠামো থেকে আসে না; এটি আসে জনগণের আস্থা, বিশ্বাস এবং তাদের সংগ্রামের ইতিহাস থেকে। যদি সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করা হয়, তবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
জুলাই যদি না থাকে, তাহলে এই নির্বাচন ও সরকারেরও বৈধতা থাকবে না—এ কথাটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি জনগণের আত্মমর্যাদার প্রতিফলন।
যদি কোনো শক্তি বলপ্রয়োগ করে কিংবা বিদেশি প্রভাব ও সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশে আবারও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ নীরব থাকবে না। অতীতে যেমন ছাত্রজনতা ও সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তেমনি প্রয়োজনে আবারও তারা গণআন্দোলনের পথে হাঁটবে। বিদেশি চাপ, রক্তচক্ষু বা কোনো ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
পরিশেষে আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি বা বিশ্বাসঘাতকতা করা মানে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এই দেশের ইতিহাস, এই দেশের শহীদদের রক্ত এবং এই দেশের মানুষের স্বপ্নকে সম্মান জানাতে হলে জুলাইয়ের চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। অন্যথায় ইতিহাস আবারও কঠিন প্রশ্ন তুলবে, এবং সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে সময়ের আদালতে।
| শনি | রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | |||
| ৫ | ৬ | ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ |
| ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ |
| ১৯ | ২০ | ২১ | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ |
| ২৬ | ২৭ | ২৮ | ২৯ | ৩০ | ||