ডা: আলী জাহান | ১৬ এপ্রিল ২০২০ | ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 1226 বার
ওকে আমি নাম ধরেই ডাকতাম। আমার এক বছরের জুনিয়র মঈন উদ্দিন। ডাক্তার মঈন উদ্দিন। করোনা যুদ্ধে শহীদ ডাক্তার মঈন উদ্দিন। আমার প্রিয় ভাই মঈন উদ্দিন।
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ডা: মঈন উদ্দিন শেষ পর্যন্ত চলেই গেলেন। এই আলো হাওয়া, মেঠো পথ, রোদেলা দুপুর, ক্লান্ত বিকেল, বৃষ্টি ঝরা দিন, মায়াবী সন্ধ্যা, জ্যোৎস্না ভরা রাত- সবকিছুকে পেছনে ফেলে তিনি চলেই গেলেন। চলে গেলেন অনন্ত সময়ের দিকে। চলে গেলেন অন্য সীমানায় দৃষ্টির বাইরে, দূরে, বহুদূরে!
আমরা সিলেটের একই কলেজ (এম সি কলেজ) থেকে এইচএসসি পাশ করেছিলাম। আমি পাস করি ১৯৮৯ সালে, সে পাশ করে ১৯৯০ সালে। এমসি কলেজের হোস্টেলে আমরা থাকতাম। আমি ছিলাম থার্ড ব্লকে। মঈন থাকতো সেকেন্ড ব্লকে। পাশাপাশি দুটো ব্লক ছিল। মঈনের ইয়ারের কয়েকজন থার্ড ব্লকে থাকতো। সে হিসাবে প্রায়ই সে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে আমাদের ব্লকে আসতো। আমার সাথে দেখা হতো। মাঝেমধ্যে গল্প হতো। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ক্যারিয়ার কোন দিকে যাবে তা নিয়ে আলোচনা হতো। সে গল্প এবং আলোচনায় মঈনের কয়েকজন বন্ধু অংশগ্রহণ করতো। ওর একটি সার্কেল ছিল। সেই সার্কেলের সবাই খুবই মেধাবী ছিল।ডাক্তার জহির (সার্জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল), ডাক্তার নুরুল হুদা নাঈম (ইএনটি সার্জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল), ফরহাদ চৌধুরী (লন্ডন প্রবাসী), মুজিবুর রহমান (ব্যাংকার, আমেরিকা প্রবাসী) সেই ঘনিষ্ঠ সার্কেলের কয়েকজন।
১৯৯০ সাল।ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হবার সুযোগ পাই আমি। উঠি ফজলে রাব্বি হলের ১৩০ নাম্বার রুমে। ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ার পুরোটাই কাটে ওখানে। পরের বছর ফজলে রাব্বি হলের ১৩০ নম্বর রুমে হঠাৎ একদিন মঈন উদ্দিন হাজির। আমাকে বললো ‘ আলী জাহান ভাই, আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছি’। আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। ঘনিষ্ঠ এবং পরিচিত একজন একই মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছে- আনন্দতো হতেই পারে!
বললাম, হোস্টেলে সিট না পাওয়া পর্যন্ত তুমি আমার রুমে, আমার সাথেই থাকো। মঈন উদ্দিনের নামে রুম বরাদ্দ হবার আগ পর্যন্ত কয়েক মাস সে আমার রুমেই ছিল। তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। সেই ঘনিষ্ঠতা একসময় আত্মার খোরাক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ থেকে চলে আসার আগ পর্যন্ত (২০০২) আত্মার সে বন্ধন অটুট ছিল। ২০০২ যখন বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিজি হোস্টেলের যে রুমে আমি থাকতাম, সেই রুমে চাবিটাও আমি তার হাতে দিয়ে আসি। সে তখন এফসিপিএস মেডিসিন পড়ছে। ডাক্তার মনিরুল ইসলাম মাহিন ভাই, ডাক্তার খালেদ মাহমুদ ভাইয়ের সাথে ডাক্তার মঈন উদ্দিনও হয়ে যায় সে রুমের বাসিন্দা।
ফজলে রাব্বি হলে থাকা অবস্থায় আমি তাকে দেখেছি। এমসি কলেজে এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে থাকা অবস্থায় মঈন উদ্দিনের মেধার পরিচয় আমি পেয়েছি। অসম্ভব মেধাবী ছেলে ছিল। নৈতিকতার মান ছিলো আকাশছোঁয়া।কিছুটা ক্রিকেট পাগল ছিল। তারচেয়েও বড় কথা সে খুবই ধার্মিক ছিল। ফজলে রাব্বি হোস্টেল মসজিদের সাথে তার অন্তর বাঁধা ছিল।ঢাকা মেডিকেল কলেজে তার কথা এবং কাজে কেউ কষ্ট পেয়েছে এমন উদাহরণ দেয়া সম্ভব হবে না। বরঞ্চ, তাকে যারা কষ্ট দিয়েছে তাদের প্রতি সে ছিল সব সময় ক্ষমাশীল এবং বন্ধুভাবাপন্ন।
মঈন উদ্দিনের মেধার প্রকাশ শুধু এমবিবিএসে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি। বিসিএস পরীক্ষায় সে প্রথমবারই সাফল্যের সাথে খুব সহজেই উত্তীর্ণ হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি এফসিপিএস (মেডিসিন) এবং এমডি (কার্ডিওলজি) করতে তাকে কোন বেগ পেতে হয়নি। তার সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সহকারি অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ।
ব্রিটেনে চলে আসার পর মোট তিনবার আমি বাংলাদেশে গিয়েছি। প্রত্যেকবারই তার সাথে দেখা হয়েছে। ব্রিটেন থেকে অসংখ্যবার তার সাথে ফোনে আলাপ হয়েছে। রোগী তার কাছে পাঠিয়েছি। হাসিমুখে কোন ভিজিট ছাড়াই আমার রোগীগুলো দেখে দিয়েছে। বাংলাদেশে যখন গিয়েছিলাম তখন তার চেম্বারে দেখা হয়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। যখন দেখা হয়েছে, প্রত্যেকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘ লন্ডনে আসছোনা কেন? তোমার যে মেধা ও অভিজ্ঞতা, তাতে বিলেতে প্র্যাকটিস করা তোমার জন্য কোন ব্যাপারই না’। মঈন উত্তর দিতো
‘চিন্তা করে’দেখি আলী জাহান ভাই’। পরে আমি বুঝতে পারতাম বাংলাদেশে ছেড়ে সে চলে আসতে চাইছেনা। এক সময় বলেই ফেললো ‘ যে দেশ এবং মাটি আমাকে এ পর্যন্ত আসতে দুহাত উজাড় করে সাহায্য করেছে, এই দেশ এবং মাটিকে ছেড়ে আসছে খুব কষ্ট হয় আলী জাহান ভাই’। আমি বুঝতে পারি, মঈনের দেশ প্রেমের আছে আমার পরাজয় হয়েছে’। কারণ আমি দেশ ছেড়ে চলে এসেছি।
সিলেটের ইবনে সিনা হাসপাতাল মঈন উদ্দিন প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতো। তাঁর সংস্পর্শে যেসব রোগী গিয়েছেন একমাত্র তারাই বলতে পারবেন সে কতটা মানবিক ডাক্তার ছিল। মঈনের গ্রামের এলাকা ছাতকের লোকজন জানেন সে কোন ধরনের লোক ছিল। মঈন অসুস্থ সুস্থ হবার পর ছাতকের মসজিদে মসজিদে তার জন্য দোয়া করা হয়েছে। লোকজন চোখের পানি ফেলে তার রোগ মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছেন। সে ফরিয়াদ অবশ্য কবুল হয়নি। মঈন তার সহকর্মী, পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী, রোগী- সবার কাছ থেকে চির বিদায় নিয়েছে।
করোনা তার সর্বগ্রাসী হাত থেকে কাউকে রেহাই দিচ্ছেনা। এর শেষ কোথায় আমরা জানি না। আমাদের মধ্যে কে কখন ছবি হয়ে যাই তা বলতে পারি না। মানব জীবনে এতো অস্থিরতা এর আগে কখনো এসেছিলো কিনা আমি জানিনা। কতোদিন এ অস্থিরতা চলবে তা কেউ বলতে পারেনা।
কুর্মিটোলা হাসপাতাল মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করতে করতে মঈন উদ্দিন হার মেনেছে। তাঁর এই মৃত্যু নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ডাক্তার সমাজকে ভাবিয়ে তুলবে। প্রশ্ন একটাই, এরপর কে? জগতসমূহের মালিক, মাবুদে এলাহী, পরম দয়ালু আল্লাহ- ডাক্তার মঈন উদ্দিনের জাগতিক ভুল ত্রুটি গুলো মাফ করে দিয়ে তাকে পরম শান্তির চাদরে ঢেকে দাও। আমরা তোমার কাছ থেকে এসেছি, তোমার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। ইন্নালিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহি
রাজিউন।
–
ডা: আলী জাহান,
ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে কর্মরত চিকিৎসক
ইমেইল- alijahanbd@gmail.com
| শনি | রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | |||
| ৫ | ৬ | ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ |
| ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ |
| ১৯ | ২০ | ২১ | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ |
| ২৬ | ২৭ | ২৮ | ২৯ | ৩০ | ||