| ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৯:১৮ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে 1 বার
ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার নীতিতে দীর্ঘদিন সায় দেওয়ার ফল পাচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলো। তারা এখন সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এই আশঙ্কা পরিষ্কারভাবে দেখাচ্ছে যে, কোনো সামরিক অভিযানের পরিণতি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এটি সংকট তৈরিতে ভূমিকা রাখা দেশগুলোর নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলাকেও সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। বর্তমানে শক্তির ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই ইউরোপীয় সরকারগুলোকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে যে, ইরানের সঙ্গে অব্যাহত সংঘাত তাদের প্রাথমিক হিসাব-নিকাশের চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর পরিণতির জন্ম দিতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে প্যাট্রিক উইন্টুর লিখেছেন, ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আটটি ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে আমেরিকা ও জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীকে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা না চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন যে, সংঘাতের পুনরুত্থান পুরো অঞ্চলে সংকট ছড়িয়ে দিতে পারে এবং তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ওই পত্রিকার মতে, তেহরানের পারমাণবিক আলোচনা যখন একটি অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক পদক্ষেপ পুনরায় চালুর লক্ষণগুলো যখন দৃশ্যমান, ঠিক তখনই একধরনের বহুজাতিক যুদ্ধবিরোধী জোট গঠনের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব লাভ করেছে।
তবে মূল প্রশ্ন হলো, আমেরিকা ও জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীর পদক্ষেপের সঙ্গে যখন ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সুর মিলিয়েছিল, তখন তারা এই নীতির নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে তা কতটা বিবেচনা করেছিল?
কিছু ইউরোপীয় সরকার আমেরিকাকে সামরিক বা লজিস্টিক সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এমন একটি প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিল যা ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছিল। আর এখন সেই দেশগুলোই সংকটের বিস্তার এবং এর অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিচ্ছে; যেন শক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যয় এই সংঘাতের প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে তাদের আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন করে তুলেছে।
ইউরোপ এখন এমন একটি নীতির বিপরীত ফল ভোগ করছে যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ প্রয়োগের সমর্থনের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় অর্থনীতির ওপর ওই একই চাপের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ মিশে আছে। ইউরোপীয় সরকারগুলো একদিকে সামরিক পদক্ষেপের পটভূমি তৈরি করা বা ওয়াশিংটনের নীতিগুলোকে সমর্থন করার ভূমিকা পালন করতে পারে না, আর অন্যদিকে এই আশা করতে পারে না যে এসব পদক্ষেপের সম্ভাব্য পরিণতি কেবল ইরান এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আজকের এই আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে নিরাপত্তা সংকট খুব দ্রুত জ্বালানি বাজার, সরবরাহ চেইন এবং সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার খরচে গিয়ে আঘাত হানে।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমীকরণের অন্যতম প্রধান ও নির্ধারণকারী নিয়ামক। এই কৌশলগত জলপথটি তেল ও গ্যাসের বৈশ্বিক বা বাণিজ্যের একটি বড় অংশের যাতায়াত পথ হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং এর মধ্য দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজের চলাচলে যেকোনো গুরুতর বিঘ্ন ঘটলে তা বৈশ্বিক বাজারকে বড় ধরনের সংকটের মুখে ফেলতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া হলো সেই পরিণতিগুলোর অংশ যা খুব সহজেই জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিতে স্থানান্তরিত হতে পারে।
ভৌগোলিক অবস্থান এবং অঞ্চলের কৌশলগত সক্ষমতার কারণে ইরানও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই কারণেই হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা—এমনকি এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্যকল্প বাস্তবায়িত না হলেও—বাজারের প্রত্যাশা এবং সরকারগুলোর হিসাব-নিকাশকে দারুণভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়াটা হয়তো কোনো নিশ্চিত বা অবশ্যম্ভাবী পরিণতি নয়, তবে এর আশপাশের চরম মুখোমুখি অবস্থানের ঝুঁকিগুলোকে উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত হবে না। যে সরকারগুলো ইরানের ওপর সামরিক চাপ বৃদ্ধির পক্ষে সমর্থন জোগায়, তাদের হিসাব-নিকাশে পারস্পরিক পাল্টা পদক্ষেপের সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর এর প্রভাবের বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত।
ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য এই বিষয়টি দ্বিগুণ গুরুত্বপূর্ণ। তেল ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি কেবল শক্তির সরবরাহের খরচই বাড়ায় না; এটি কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যয়, পণ্য পরিবহন, সেবা খাত এবং পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর খরচও বাড়িয়ে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্র আকার ধারণ করে এবং ইউরোপীয় শিল্পগুলো বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে। এভাবেই সংকটের পরিণতি বৈদেশিক সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপীয় অর্থনীতিগুলোর কর্মক্ষমতা এবং নাগরিকদের সরাসরি জীবনের একটি বড় ইস্যুতে পরিণত হয়।
এই কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলোর আজকের এই উদ্বেগটিকে নিছক একটি কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; এই উদ্বেগ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সরাসরি সংঘর্ষকেই ফুটিয়ে তোলে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুর মেলানো হয়তো কিছু ইউরোপীয় সরকারের রাজনৈতিক বা নিরাপত্তার স্বার্থে হতে পারে, তবে এই সমর্থনের অর্থ এই নয় যে আমেরিকার সিদ্ধান্তের পরিণতি থেকে তারা সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকবে। যখন সংকট ছড়িয়ে পড়ে, তখন ওয়াশিংটনের মিত্রদেরও এমন সব খরচের মুখোমুখি হতে হয় যেগুলোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কোনো হাত ছিল না এবং যার প্রভাব চাইলেও তারা সহজেই রোধ করতে পারে না।
আটটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ইস্তাম্বুলের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে সংকটের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ এখন এই অঞ্চল এবং ইউরোপের দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুতর একটি বিবেচনায় পরিণত হয়েছে। অবশ্য, সামরিক পদক্ষেপ পুনরায় শুরু করার বিরোধিতা করার অর্থ এই নয় যে ইরানের প্রতি এই দেশগুলোর নীতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন এসেছে; সম্ভবত অন্যান্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা খরচের আশঙ্কাই তাদের এই ধরনের অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। তা সত্ত্বেও, এই উদ্বেগটি এও স্পষ্ট করে দেয় যে সংঘাতের ধারাবাহিকতা আমেরিকার মিত্রদের মধ্যেও বিভেদ তৈরি করতে পারে এবং ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক খরচ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তেল ও জ্বালানির দাম নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগের বৃদ্ধি একটি স্পষ্ট বাস্তবতারই কথা মনে করিয়ে দেয়: কোনো সংকটের তীব্রতা বাড়াতে ভূমিকা রেখে এটা আশা করা যায় না যে তার সমস্ত ব্যয় কেবল প্রতিপক্ষ শিবিরের কাঁধেই থাকবে। ইউরোপীয় সরকারগুলোকে বর্তমান অভিজ্ঞতা থেকে এটি শিক্ষা নিতে হবে যে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, এবং সামরিক নীতিগুলো তাদের নিজেদের সমর্থকদের জন্যই অপ্রত্যাশিত পরিণতির সৃষ্টি করতে পারে। এখন যখন জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কেন এই পথের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিণতিগুলোকে আজকের মতো গুরুত্ব দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর হিসাব-নিকাশে রাখা হয়নি?