• শিরোনাম

    জাপানের প্রাচীনতম মসজিদ, কোবের মুসলিম সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের প্রতীক

    | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২১ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে 4 বার

    জাপানের প্রাচীনতম মসজিদ, কোবের মুসলিম সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের প্রতীক

    জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এই অবস্থায় পশ্চিমাঞ্চলীয় কোবে শহরে অবস্থিত দেশটির প্রাচীনতম মসজিদটি সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠার প্রত্যাশা রাখে।
    উনিশ শতক থেকে কোবের সমৃদ্ধ বন্দরটি বহু সংস্কৃতির এক উৎস হয়ে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এসে এই শহরে বসতি স্থাপন করেন এবং রন্ধনশৈলী থেকে শুরু করে স্থাপত্য পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান রাখেন।

    কিতানো এলাকাটি কোবে শহরের প্রাণবন্ততার এক বিখ্যাত উদাহরণ, যেখানে বহু পুরোনো পাশ্চাত্য ধাঁচের বাড়িঘর রয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে সামান্য দূরেই সম্পূর্ণ ভিন্ন শৈলীর অপর একটি নজরকাড়া ভবন রয়েছে। বিগত ৯০ বছর ধরে এটি জাপানের মুসলমানদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে আসছে।

    মুসলিমরা দীর্ঘকাল ধরে কোবে মুসলিম মসজিদকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে দেখে আসছেন।
    জুন মাসে একজন মুসল্লি বলেন, “জাপানে এমন মসজিদ খুব বেশি নেই। এখানে এলেই আমি এক ধরনের স্বস্তি ও শান্তি পাই।”

    অপর এক ব্যক্তি বলেন, “আমি এখানে আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারি এবং সান্ত্বনা ও আরোগ্য লাভ করতে পারি।”

    এই ধরনের মন্তব্য নিঃসন্দেহে কোবে মুসলিম মসজিদের সভাপতি আসিফ মোহাম্মদকে খুশি করে। একই সাথে, তিনি এটাও উল্লেখ করতে চান যে এই স্থাপনাটি শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য।

    তিনি বলেন, “মসজিদ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু বছর ধরে একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমি সবসময় এই সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।”

    মসজিদের সভাপতি আসিফ মোহাম্মদ।
    যুদ্ধ এবং দুর্যোগের পরেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে মসজিদটি
    কোবে মুসলিম মসজিদ সত্যিই কালের আবর্তে টিকে রয়েছে। ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, এই স্থাপনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিমান হামলা এবং তার কয়েক দশক পরে ১৯৯৫ সালের হানশিন-আওয়াজি মহাভূমিকম্পের কবল থেকে রক্ষা পায়। কেউ কেউ একে “অলৌকিক মসজিদ” বলে বর্ণনা করে থাকেন।

    সংকটময় মুহূর্তগুলোতে কোবে মুসলিম মসজিদ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছে। বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর জাপানের ভিতর ও বাইরের মুসলিমদের কাছ থেকে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী এসে পৌঁছায় এবং ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে বহু মানুষের মাঝে তা বিতরণ করা হয়।

    ১৯৯৫ সালের হানশিন-আওয়াজি মহাভূমিকম্পের পর মানুষ কোবে মুসলিম মসজিদে আশ্রয় নেয়।
    আসিফ বলেন, “যে বিষয়টি আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে তা হলো, আমরা কীভাবে সংকটে পড়া মানুষদের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে পেরেছিলাম। সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে মিলে অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে আমরা আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।”

    মসজিদ কর্তৃপক্ষ যে-কোনো ধরনের বিভেদ দূর করতে আগ্রহী
    আধুনিক জাপান এক নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি বাসিন্দাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে কিছু ক্ষেত্রে টানাপড়েনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

    মার্চ মাসে কোবে মুসলিম মসজিদে রমজান মাসের সমাপ্তি উপলক্ষ্যে একটি প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে বহু মুসলমানের সমাগম ঘটে, যাদের মধ্যে কয়েকজনকে ভবনটির বাইরের রাস্তায় নামাজ পড়তে দেখা যায়।

    মসজিদ পরিচালনা কমিটির লোকজন বলছেন, তারা আগেই পুলিশের অনুমতি নিয়েছিলেন এবং ফুটপাতটি মাত্র ১৫ মিনিটের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।

    কিন্তু সেই ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কিছু মন্তব্যে দাবি করা হয় যে, সমাবেশটি পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছিল। অন্যগুলো ছিল বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ।

    মে মাসের এক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে মসজিদ কমিটি বাড়তি পদক্ষেপ নেন।
    ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে মে মাসে কোবে মুসলিম মসজিদে আরও একটি বড়ো সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে এইবার মসজিদ কমিটি সম্ভাব্য সামাজিক বিভেদের বিষয়ে আরও বেশি সচেতন ছিল।

    অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে প্রথমবারের মতো তারা নামাজকে তিনটি আলাদা সময়ে ভাগ করেছিলেন। এছাড়াও তারা নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করেন এবং ফুটপাতে লোকজনের জমায়েত এড়াতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

    প্রচেষ্টাটি সফল প্রমাণিত হয়। সকল মুসল্লিকে মসজিদ প্রাঙ্গণের মধ্যেই স্থান দেওয়া হয় এবং অনুষ্ঠানটি কোনো রকম বিঘ্ন ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছিল।

    কোবের এক বাসিন্দা বলেন, “এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশিদের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন। আর ব্যক্তিগতভাবে, আমার কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।”

    অপর এক ব্যক্তি বলেন, “এখানকার রাস্তাগুলো বেশ সরু এবং লোকজন প্রতিদিন তা ব্যবহার করে। এই বিষয়টি নিয়ে সবাই সচেতন থাকলে আমি কোনো সমস্যা দেখি না।”

    সকল ধর্ম ও পটভূমির মানুষের জন্য মসজিদের দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত।
    স্থানীয় বাসিন্দারা নির্দ্বিধায় তাদের উদ্‌বেগ প্রকাশ করতে পারেন
    আসিফ এবং তার দল সমাজে আরও বেশি সহাবস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমানে কাজ করছেন। কেবল শুক্রবার ছাড়া যখন মুসলমানরা জামাতে নামাজে অংশ নেন, সেই দিনটি বাদ দিয়ে মসজিদটি সকল লিঙ্গ ও ধর্মের মানুষকে স্বাগত জানিয়ে থাকে।

    জুন মাসে স্থানীয় এলাকাবাসীদের সমিতির সদস্যরা মসজিদ পরিদর্শনে অংশ নেন। মতবিনিময় করার পাশাপাশি তারা ইসলামি সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং ধর্মের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুত করা খাবারও এমনকি একসাথে গ্রহণ করেন। সমাজে মসজিদের অবস্থান নিয়ে যে-কোনো উদ্‌বেগের কথা নির্দ্বিধায় প্রকাশের সুযোগও তাদের দেওয়া হয়েছিল।

    কোবের মুসলমানরা সম্প্রতি স্থানীয় এলাকাবাসীদের সমিতির সদস্যদের সাথে যৌথ ভোজে অংশ নিয়েছেন।
    একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, “আমি এই প্রথম এখানে এসেছি এবং অনেক কিছু শিখেছি। আমি জানতাম না যে মসজিদটি এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। এখন আমার মনে হচ্ছে, মুসলমানরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে কী করে তা বোঝাটা জরুরি।”

    আসিফ মসজিদটিকে শহরের ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেন। তবে, তিনি এটাও উপলব্ধি করছেন যে, জাপানে পরিবর্তন এসেছে এবং অন্যান্য মসজিদগুলোকেও ক্রমবর্ধমান বিভেদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তিনি মুসলিম নবাগতদের তাদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে আরও কার্যকরভাবে একীভূত হতে সাহায্য করার পাশাপাশি নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে আরও গভীর উপলব্ধি গড়ে তুলতে সহায়তা করার প্রত্যাশা রাখেন।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০ 
  • ফেসবুকে দশদিক